কীর্তনখোলার তীর থেকে পদ্মার পার; ইতিহাস ঐতিহ্য ও আমের রাজ্যে একদিন … কীর্তনখোলার তীর থেকে পদ্মার পার; ইতিহাস ঐতিহ্য ও আমের রাজ্যে একদিন ... - For update barisal news visit barisallive24.com
বরিশাল, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং। সর্বশেষ আপডেট: ৩ মিনিট আগে
শিরোনাম

বরিশাল লাইভ ডেস্ক


কীর্তনখোলার তীর থেকে পদ্মার পার; ইতিহাস ঐতিহ্য ও আমের রাজ্যে একদিন …

সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ ৪:৪০ অপরাহ্ণ

আকিব মাহমুদ, বরিশালঃ ঘুরে বেড়ানোর নেশাটা আমার ছোটবেলা থেকেই, তাই নতুন কোথাও যাবার নিমন্ত্রন পেলে আর তর সইতে চায় না। জুলাই মাসের মাঝের দিকে বড় মামা সিল্ক সিটি খ্যাত রাজশাহীতে বেড়িয়ে আসার প্রস্তাব দিলেন। রাজিও হয়ে গেলাম, তবে একা নই পুরো ফ্যামিলি। মানে আমি,বাবা,মা আর ছোট ভাই হৃদয়। বরিশাল সিটি নির্বাচন ৩০ জুলাই হওয়াতে তার আগে রাজশাহী যাওয়ার উপায় রইল না। তাই ৩০ জুলাই সিটি নির্বাচনে ভোট প্রদান শেষে ৩১ জুলাই রাতে লঞ্চে উঠলাম। সুরভী-৯ লঞ্চে কীর্তনখোলার তীর থেকে যাত্রা শুরু হল রাত ৯টায়। শান্ত নদীর বুক চিরে ছুটে চলেছে লঞ্চ। মৃদুমন্দ বাতাস নদীর জলের শব্দ আর মাঝ আকাশে চাঁদ এক রহস্যময় রুপের সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতির অপরুপ রুপের গোলক ধাধা দেখতে দেখতে সকাল ৮টার দিকে পৌছুলাম যান্ত্রিক শহর ঢাকায়। লঞ্চ থেকে নেমে চলে গেলাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন রেলওয়ে অফিসার্স রেস্ট হাউজে। মামা বললেন ফ্রেশ হয়ে সকালের নাশতা খেয়ে নিতে। এরপর চাইলে আশেপাশে কোথাও ঘোরাঘুরি করে দুপুরের খাবার খেতে। দুপুর ২.৩০এ সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে করে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হবে আমাদের।

কিন্তু দুপুর ১টার দিকে মামা জানালেন, ট্রেন আসতে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও ঘন্টাখানেক বেশি দেরি হবে তাই রেস্ট হাউজেই সময়টা কাটিয়ে বিকাল সাড়ে ৩টায় ট্রেনে উঠলাম। টিকেট আগে থেকেই রিজার্ভেশন করে রেখেছিলেন মামা।বলে রাখা ভাল এর আগে আমি মিটারগেজ লাইনে বহুবার চলাচল করেছি কিন্তু ব্রডগেজ লাইনে এটাই আমার প্রথম যাত্রা। ট্রেন ছাড়ার পূর্বমুহুর্তে আমার পাশের সিটে এক যাত্রী এসে বসলেন। ওনার আশেপাশে অফিসারদের আনাগোনা দেখে বুঝলাম বড় মাপের অফিসারই হবেন। কিছুক্ষন বাদে মামা বললেন, ভদ্রলোক রেলপথ মন্ত্রানালয়ের যুগ্ম সচিব। ট্রেন ভ্রমনের জন্য যেই উৎসাহ উদ্দিপনা নিয়ে ট্রেনে উঠেছিলাম মুহুর্তেই সেটা ম্লান হয়ে গেল। যুগ্ম সচিবের পাশে বসে নেট ব্রাউজিং গান শোনা এসব বড্ড বেমানান। তাই গোবেচারা হয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। কিন্তু কতক্ষনই বা আর চুপচাপ বসে থাকা যায়। ভদ্রলোক ও কিছু বলছেন না, আমিও চুপচাপ। ভাবলাম একটা লম্বা ঘুম দেই। ঘুমে ঘুমে সময়টা পেরিয় যাক। দিলাম লম্বা ঘুম …  কিন্তু যখন উঠলাম তখন কেবল বঙ্গবন্ধু সেতুতে উঠছে ট্রেন। মানে ঢাকা থেকে মাত্র দুই ঘন্টার দূরত্ব। জানালার পাশ দিয়ে নদী দেখে দেখে ২০ মিনিটের মত সময় পার করলাম। এরপর আবার ঘুম। এরপর যখন উঠলাম তখন ট্রেন বেশ ফাকা, পূর্বের স্টেশনে যাত্রীরা অনেকেই নেমে গেছে। কেউ কেউ লাগেজ নামাচ্ছে। ট্রেনের স্পিকারে নারী কন্ঠে ভেসে এল আর কিছুক্ষনের মধ্যেই রাজশাহী স্টেশনে পৌছুবে সিল্কসিটি এক্সপ্রেস।

যখন রাজশাহীতে পা রাখলাম তখন রাত সাড়ে ১০টা। স্টেশন থেকে বের হয়ে অটোরিক্সা নিয়ে চলে গেলাম রেলওয়ে অফিসার্স কোয়ার্টারে। ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিউজের কাজ নিয়ে বসে পরলাম। কিন্তু আহা কি যন্ত্রনা নেটওয়ার্ক আছে কিন্ত ইন্টারনেট কানেকশন খুব স্লো। কচ্ছপ গতির ইন্টারনেট দিয়ে ৩০মিনিটের কাজ দুই ঘন্টায় শেষ করে আবার ঘুম।

 

ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগে ফ্রেশ হয়ে নাশতা খেয়ে কোয়ার্টার থেকে বেরোতেই রাজশাহীর সবচেয়ে বড় উদ্যান শহীদ এ এইচ এম খাইরুজ্জামান উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করলাম। হাটতে হাটতে হারিয়ে গেলাম উদ্যানের মাঝে। নানান ধরনের গাছপালায় ঘেরা এই উদ্যান, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে লেক, যেখানে নৌকা ভাসানো হয়েছে। চাইলেই যে কেউ লেকের পানিতে নৌকায় চরে ভাসতে পারেন। শিশুদের বিনোদনের জন্য নানান রকমের রাইডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রয়েছে পিকনিক স্পট। কেউ যদি এই উদ্যানে এসেই রান্না করে খেতে চান তার জন্য রয়েছে মাটির চুলা। উদ্যানের মাঝে মাঝেই নানার রকমের ও ডিজাইনের ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে। লেকের মধ্যে ছোট্ট দ্বিপে রয়েছে মৎস্যকণ্যা। বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের রাখা হয়েছে এখানে, পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত চারদিক। উদ্যানের মধ্যে দিয়ে হাটতে গেলেই চোখে পরবে কখনো রাস্তায়, কখনো গাছে গাছে ছুটে চলেছে কাঠবেড়ালী। মাটি দিয়ে বেশ উচু করে বানানো হয়েছে পাহাড়, সেই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ঝর্না। বাঘ,সিংহ, হাতি, জিরাফ সহ অনেক প্রানীই রয়েছে এই উদ্যানটিতে। প্রায় দুই ঘন্টা সময় ব্যয় করে বাদাম খেতে খেতে ঘুরে দেখলাম পুরো উদ্যানটি।
উদ্যান থেকে বেড়িয়ে গাড়ি রিজার্ভ করে বেড়িয়ে পরলাম গোটা শহর দেখতে, চার লেনের রাস্তা মাঝখানে  ডিভাইডার, আর ডিভাইডারটি সাজানো হয়েছে নানান প্রজাতির গাছাপালা দিয়ে। এসব দেখতে দেখতে ছুটে চলা রাজশাহী শহরের মধ্য দিয়ে। বেলা ১২টার দিকে প্রবেশ করলাম ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।ঘুরে ঘুরে দেখতে মনে পরে গেল ২০১৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিলাম। পরিক্ষা দিতে যাবার জন্য টিকেট ও কেটেছিলাম।কিন্তু তৎকালীন সময়ে বিএনপির হরতাল অবরোধের কারনে যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। এসব ভাবতে ভাবতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থান, একাডেমিক ভবনগুলো ঘুরে দেখলাম, ঘুরে দেখলাম পুরো বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেড়িয়ে চলে গেলাম পদ্মা নদীরে তীরে। যেই নদীর তীর ঘেসে গড়ে উঠেছে রাজশাহী শহর, সেই রাজশাহী শহরকেই গ্রাস করতে বসেছে পদ্মা। রাজশাহী শহর রক্ষায় নেয়া হয়েছে নানামূখি উদ্যোগ। ইংরেজি T আকৃতির মত তিনটি বাধ দেয়া হয়েছে নদীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন পয়েন্টে। পদ্মা তীরের নির্মল বাতাস আর স্রোতস্বিনী পদ্মার রুপ দেখে ফিরে এলাম রুমে।

 

রাত ৮টার দিকে মামা বললেন আগামীকাল আমরা চাপাইনবাবগঞ্জ যাব, আম আর ইতিহাস ঐতিহ্যের শহর দেখতে হলে ভোর সাড়ে ৫টার ট্রেনে করে যেতে হবে চাপাইনববাগঞ্জে। রাত ১১টার দিকে মামা বললেন, ভোরবেলা এখান থেকে যানবাহন পেতে সমস্যা হতে পারে, তার থেকে স্টেশনে গিয়ে থাকি, ওখানে আমার রুম আছে। রাতে ওখানে ঘুমাব, ভোরবেলা ঘুম থেকে জেগেই ট্রেন ধরব। রাতের খাবার শেষ করে রাত ১২টার দিকে পৌছুলাম রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন।

রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে সকাল সাড়ে ৫টায় ছুটলাম চাপাইনবাবঞ্জের উদ্দ্যেশ্যে। রাজশাহী শহরকে পেছনে ফেলে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। শহর ছেড়ে বেড়োতেই চোখে পরতে শুরু করল মাটির দেয়ালের ঘর। বিশাল বিল, তার ফাকে ফাকে অনেক জমি জুড়ে করা হয়েছে আমবাগান। এসব দেখতে দেখতে ছুটে চলছি ট্রেনে করে। সকাল ৮টায় চাপাইনবাবগঞ্জ নামলাম। আগে থেকে গাড়ি রিজার্ভ করা ছিল। ড্রাইভারকে সকালের নাস্তা খেতে বলে কিছুক্ষন স্টেশন মাস্টারের রুমে রেস্ট নিলাম। এরপর স্টেশন সংলগ্ন একটা হোটেলে সকালের নাশতা খেয়ে বেরিয়ে পরলাম ইতিহাস আর ঐতিহ্যের শহর চাপাইনবাবগঞ্জ চষে বেড়াতে।

মহাসড়ক দিয়ে ছুটে চলেছি, রাস্তার দুইপাশেই বিশাল বিশাল আমবাগান চোখে পরছে। গাছে গাছে আম ঝুলে আছে। আরো কিছুদুর যাওয়ার পর বড় বড় আমগাছের আমগুলো দেখতে পেলাম গাছেই প্যাকেট করা। পোকামাকড়ের আক্রমন, বৈরি আবহাওয়া থেকে বাচাতে আমের কুড়ি থাকাকালেই কাগজ দিয়ে বানানো বিশেষ প্যাকেটে মুড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে আমগুলো দেখতেও বেশ সুন্দর হয়, আর পোকামাকড় ও আক্রমন করতে পারে না। যেতে যেতেই চোখে পরল বাই সাইকেলের দুই পাশেই ঝুড়ি বসিয়ে আম ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাজারে। এমনভাবে ঝুড়ি গুলো বসানো হয়, ফলে চালকের বসার কোনো সুযোগই থাকেনা। অগত্যা ঠেলে ঠেলেই নিয়ে যেতে হয় সাইকেলে করে ঝুড়ি ভর্তি আম। একটা বাজার দেখে গাড়ি থামিয়ে চাপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত চাপা কলা কিনলাম, খেতে খেতে আবারো ছুটে চলা।

চলতে চলতে চলে এলাম ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক সোনা মসজিদে। চারিপাশটা বেশ ভাল করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। পাথরের নির্মিত এই মসজিদটির ছাদ গম্বুজ আকৃতির। একটা সময় এই মসজিদে বিচারকার্য বসত, কাজীর বিচারের জন্য মাচা পাতা রয়েছে। মসজিদের দেয়ালগুলো ছুয়ে দেখে পাথর খোদাই করে কারুকার্য সৃষ্টি করা সেই শ্রমিকের পরিশ্রম উপলব্ধি করতে চাইলাম।
সোনা মসজিদ দেখা শেষ হলে “তাহখানা” দেখতে এলাম। মুঘল সম্রাটদের জন্য বিশ্রামাগার ছিল এই তাহখানা, এখানে রয়েছে বিশেষ স্নানাগার, এছাড়াও মাটির পাইপ দিয়ে গরম জল আসার ব্যাবস্থা ছিল, রয়েছে ছোট ছোট কুঠুরি, এমনভাবে ঘরগুলো করা হয়েছে যা গোলক ধাধায় ফেলে দেবে। এক কোনের দিক থেকে মাটির নিচে নেমে গেছে সিড়ি, ঐ সিড়ি ধরে নিচে নামতেই পাওয়া গেল সুরঙ্গপথ। কিন্তু আলো না থাকায় সুরংপথ ধরে এগোতে সাহস হল না। তাহখানার পাশেই রয়েছে দাফিউল বালা দিঘী। এছাড়াও প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন মসজিদ।
এসব দেখার পরে আবার ছুটলাম ভারত চাপাইনবাবগঞ্জ স্থল বন্দরে। ওপার থেকে ট্রাক আসছে, এপার থেকে ট্রাক যাচ্ছে। বর্ডারে গিয়ে দেখা গেল, বিজিবির চেকপোস্ট, ভারত গমনের জন্য ইমিগ্রেশনের অপেক্ষায় বসে আছেন অনেকেই। অনুমতি নিয়ে কিছুটা সামনে এগোলাম। ছোট্ট একটা সীমান্তপিলার, যার এপাশে বাংলাদেশ, আর ওপাশে ভারত।  আমার কাছে বর্ডার খুব ইন্টারেস্টিং লাগে, আপনি চাইলে একই সাথে দুই দেশেই পা রাখতে পারেন। এক পা বাংলাদেশে, আরেক পা ভারতে। স্থলবন্দর ঘুরে দেখা শেষে এবার রাজশাহীতে ফেরার পালা …।
দুপুরের খাবার চাপাইনবাবগঞ্জে খেয়ে আবার ট্রেনে উঠে বসলাম, বিকাল ৫টা নাগাদ পৌছুলাম রাজশাহীতে। পরদিন ভোরের ট্রেন ধরে দুপুরে ঢাকায় ফিরলাম। রাতে লঞ্চ ধরে পরদিন ভোরে পৌছুলাম কীর্তনখোলার তীরে আমার শহর বরিশালে।

পাঠকের মতামত:

[wpdevart_facebook_comment facebook_app_id="322584541559673" curent_url="" order_type="social" title_text="" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য
Developed by: NEXTZEN-IT